হার্টের সমস্যা হলে কি কি লক্ষণ দেখা দেয়? হার্ট অ্যাটাক যে কারণে হতে পারে
ভূমিকা
মানবদেহের রক্ত সঞ্চালন তন্ত্রের কেন্দ্রীয় অঙ্গ হলো হৃদপিণ্ড। এটি একটি জীবন্ত পাম্পের মতো কাজ করে সংকোচন ও প্রসারণের মাধ্যমে সারা শরীরে রক্ত পাঠায় এবং শিরা দিয়ে ফিরে আসা রক্ত গ্রহণ করে। রক্তের সঙ্গে অক্সিজেন ও পুষ্টি উপাদান কোষে পৌঁছে, আবার বর্জ্য পদার্থ সংগ্রহ হয়ে রক্তের মাধ্যমে নির্দিষ্ট অঙ্গে যায়। হৃদপিণ্ড নিয়মিতভাবে কাজ না করলে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে রক্ত ও অক্সিজেন সরবরাহ কমে যায়, ফলে বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, মাথা ঘোরা, অজ্ঞান হওয়া, হার্ট অ্যাটাক বা হার্ট ফেলিওরের মতো গুরুতর সমস্যা দেখা দিতে পারে।
একজন মানুষের জীবদ্দশায় হৃদপিণ্ড গড়ে কয়েক বিলিয়ন বার স্পন্দিত হয় এবং বিপুল পরিমাণ রক্ত সারা দেহে পাম্প করে। তাই হার্টের সামান্য অসামঞ্জস্যও কখনও কখনও বড় ঝুঁকির কারণ হতে পারে। এই লেখায় হার্টের সমস্যা হলে সাধারণ লক্ষণগুলো, হার্ট অ্যাটাক কীভাবে হয়, কারা বেশি ঝুঁকিতে থাকে, কী লক্ষণ দেখলে জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে যেতে হবে, এবং কীভাবে প্রতিরোধ করা যায় তা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।
হার্টের সমস্যা বলতে কী বোঝায়
হার্টের সমস্যা বলতে শুধু হার্ট অ্যাটাক বোঝায় না। হার্টের সমস্যার মধ্যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধরন হলো:
১) করোনারি আর্টারি ডিজিজ (হার্টের রক্তনালীতে ব্লক/সংকোচন)
২) অ্যাঞ্জাইনা (পরিশ্রমে বুকে চাপ/ব্যথা, বিশ্রামে কমে)
৩) হার্ট অ্যাটাক বা মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন (হঠাৎ রক্তনালী সম্পূর্ণ বা প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে হার্টের পেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া)
৪) হার্ট ফেলিওর (হার্ট পর্যাপ্তভাবে রক্ত পাম্প করতে না পারা)
৫) হার্টের ছন্দের সমস্যা বা অ্যারিদমিয়া (হার্টবিট অনিয়মিত হওয়া)
৬) ভালভের রোগ (হার্টের ভালভ ঠিকমতো খুলতে বা বন্ধ হতে না পারা)
৭) জন্মগত হৃদরোগ (জন্ম থেকেই হার্টের গঠনগত সমস্যা)
এই ভিন্ন ভিন্ন সমস্যার লক্ষণ অনেকটাই একরকম হতে পারে, আবার কিছু লক্ষণ নির্দিষ্ট রোগে বেশি দেখা যায়। তাই লক্ষণকে গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
হার্টের সমস্যা হলে সাধারণত যে লক্ষণগুলো দেখা দিতে পারে
হার্টের সমস্যার লক্ষণ সবসময় একইভাবে প্রকাশ পায় না। কারও ক্ষেত্রে খুব স্পষ্ট লক্ষণ হয়, আবার কারও ক্ষেত্রে লক্ষণ অস্পষ্ট বা অস্বাভাবিক হতে পারে। তবুও কিছু সাধারণ লক্ষণ বেশি দেখা যায়।
১) বুকে ব্যথা, চাপ বা অস্বস্তি
বুকে মাঝখানে বা বাম পাশে চাপ ধরা, ভারী লাগা, মোচড়ানো ব্যথা, জ্বালা বা অস্বস্তি অনুভূত হতে পারে। অনেক সময় এটি পরিশ্রম, হাঁটা, সিঁড়ি ভাঙা, ঠান্ডা আবহাওয়া, মানসিক চাপ বা ভারী খাবারের পর বাড়ে এবং বিশ্রামে কমে যেতে পারে। এটি অ্যাঞ্জাইনার বৈশিষ্ট্য হতে পারে, যা হার্টের রক্তনালী সংকুচিত হওয়ার ইঙ্গিত দেয়।
২) শ্বাসকষ্ট
কিছুদূর হাঁটলেই হাঁপিয়ে যাওয়া, সিঁড়ি উঠলে দম বন্ধ লাগা, শোয়া অবস্থায় শ্বাসকষ্ট হওয়া, রাতে শ্বাসকষ্টে ঘুম ভেঙে যাওয়া বা বসলে আরাম লাগা—এসব হার্ট ফেলিওরসহ বিভিন্ন হার্ট সমস্যায় দেখা যেতে পারে।
৩) বুক ধড়ফড় করা বা হার্টবিট অনিয়মিত লাগা
হঠাৎ দ্রুত হার্টবিট, থেমে থেমে ধড়ফড়, বুক কাঁপা, অস্থিরতা, সঙ্গে মাথা ঘোরা বা দুর্বলতা থাকলে অ্যারিদমিয়া হতে পারে। কিছু অ্যারিদমিয়া বিপজ্জনক, তাই উপেক্ষা করা ঠিক নয়।
৪) অতিরিক্ত ক্লান্তি ও দুর্বলতা
অল্প কাজেই ক্লান্ত হয়ে পড়া, আগের মতো সহ্যশক্তি না থাকা, সারাদিন নিস্তেজ লাগা হার্টের রক্ত পাম্প করার ক্ষমতা কমে গেলে হতে পারে। বিশেষ করে নারী ও ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে ক্লান্তি কখনও কখনও হার্ট সমস্যার প্রধান লক্ষণ হিসেবে দেখা দেয়।
৫) মাথা ঘোরা, চোখ অন্ধকার দেখা, অজ্ঞান হওয়া
রক্তচাপ কমে গেলে বা হার্টের ছন্দ অস্বাভাবিক হলে মস্তিষ্কে রক্ত প্রবাহ সাময়িক কমে গিয়ে এসব লক্ষণ হতে পারে। বারবার হলে অবশ্যই পরীক্ষা করানো প্রয়োজন।
৬) পা, গোড়ালি বা পায়ের পাতা ফুলে যাওয়া
হার্ট দুর্বল হলে শরীরে পানি জমতে পারে। ফলে গোড়ালি ফুলে যায়, জুতা টাইট লাগে, দিনের শেষে ফুলে বেশি দেখা যায়। কখনও পেট ফাঁপা বা ওজন দ্রুত বেড়ে যাওয়াও হতে পারে।
৭) ঘাম, বমি বমি ভাব, বুকজ্বালা বা উপরের পেটে অস্বস্তি
অনেক সময় হার্টের সমস্যা গ্যাস্ট্রিকের মতো মনে হতে পারে। বিশেষ করে হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে উপরের পেটে চাপ বা অস্বস্তি, বমি বমি ভাব এবং ঠান্ডা ঘাম হতে পারে।
হার্ট অ্যাটাক কী এবং যে কারণে হয়
হার্ট অ্যাটাকের আরেক নাম মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন। মায়োকার্ডিয়াল অর্থ হৃদপেশি এবং ইনফার্কশন অর্থ রক্ত সরবরাহ কমে গিয়ে টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া বা মারা যাওয়া। হার্টের পেশি জীবিত থাকার জন্য সারাক্ষণ অক্সিজেনসমৃদ্ধ রক্ত প্রয়োজন, যা করোনারি ধমনীর মাধ্যমে সরবরাহ হয়।
হার্ট অ্যাটাক সাধারণত কয়েকটি ধাপে ঘটে:
১) করোনারি ধমনীর দেয়ালে চর্বি জমা ও প্লাক তৈরি
দীর্ঘদিন ধরে রক্তে ক্ষতিকর কোলেস্টেরল, প্রদাহজনিত পরিবর্তন, ধূমপান, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ইত্যাদি কারণে ধমনীর ভেতরের দেয়ালে চর্বি, ক্যালসিয়াম, প্রোটিন ও অন্যান্য উপাদান জমে প্লাক তৈরি হয়। এই প্রক্রিয়াকে অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস বলা হয়।
২) প্লাক বড় হওয়া এবং ধমনী সংকুচিত হওয়া
প্লাক ধীরে ধীরে বড় হয়ে ধমনীর ভেতরের পথ সরু করে দেয়। তখন পরিশ্রমের সময় হার্টের বেশি অক্সিজেন দরকার হয়, কিন্তু সরু রাস্তায় পর্যাপ্ত রক্ত যেতে পারে না। এ অবস্থায় পরিশ্রমে বুকে ব্যথা বা চাপ হতে পারে, যা অ্যাঞ্জাইনা নামে পরিচিত।
৩) প্লাক ফেটে যাওয়া এবং রক্ত জমাট বাঁধা
কোনও সময় প্লাকের উপরিভাগ ফেটে যেতে পারে। প্লাক ফাটলে শরীর সেটিকে ক্ষত হিসেবে ধরে সেখানে অনুচক্রিকা জমে এবং রক্ত জমাট বাঁধার প্রক্রিয়া শুরু হয়। ফলে ধমনীর ভেতরে হঠাৎ বড় ক্লট তৈরি হতে পারে।
৪) ধমনীর পথ আংশিক বা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়া
রক্ত জমাট বাধা ক্লটের কারণে করোনারি ধমনী আংশিক বা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেলে হার্টের পেশিতে অক্সিজেন পৌঁছানো বন্ধ বা খুব কমে যায়। কয়েক মিনিটের মধ্যে হার্টের পেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে। চিকিৎসা যত দেরি হয়, ক্ষতি তত বাড়ে। এটাই হার্ট অ্যাটাকের মূল বিপদ।
হার্ট অ্যাটাক হওয়ার ঝুঁকি কার বেশি
কিছু কারণ নিয়ন্ত্রণ করা যায়, কিছু কারণ নিয়ন্ত্রণ করা যায় না।
যেগুলো নিয়ন্ত্রণ করা যায়:
১) ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য (সিগারেট, জর্দা, গুল ইত্যাদি)
২) উচ্চ রক্তচাপ
৩) ডায়াবেটিস
৪) উচ্চ কোলেস্টেরল ও ট্রাইগ্লিসারাইড
৫) স্থূলতা, বিশেষ করে পেটের মেদ
৬) শারীরিক পরিশ্রম কম থাকা
৭) অতিরিক্ত লবণ, চিনি, ট্রান্সফ্যাট ও প্রক্রিয়াজাত খাবার বেশি খাওয়া
৮) দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ, ঘুমের ঘাটতি
৯) অতিরিক্ত অ্যালকোহল
১০) কিছু মাদকদ্রব্য (বিশেষ করে স্টিমুল্যান্ট ধরনের) হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়াতে পারে
যেগুলো নিয়ন্ত্রণ করা যায় না:
১) বয়স বাড়া
২) পরিবারে কম বয়সে হার্ট রোগের ইতিহাস
৩) পুরুষদের ক্ষেত্রে তুলনামূলক বেশি ঝুঁকি, তবে নারীদের মেনোপজের পরে ঝুঁকি বেড়ে যায়
হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণসমূহ (বিস্তারিত)
হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ দ্রুত চিনতে পারা জীবন বাঁচাতে পারে। অনেক সময় হার্ট অ্যাটাকের আগে কয়েকদিন বা কয়েক সপ্তাহ ধরে হালকা সংকেত থাকতে পারে, আবার কখনও হঠাৎ তীব্রভাবে শুরু হতে পারে।
১) বুকে তীব্র চাপ বা ব্যথা
বুকের মাঝখানে বা বাম দিকে ভারী চাপ, পেষণ করা ব্যথা, বুক চেপে ধরা অনুভূতি, জ্বালা বা অস্বস্তি হতে পারে। এটি কয়েক মিনিটের বেশি স্থায়ী হতে পারে, কমে আবার বাড়তে পারে। বিশ্রামে কমে না গেলে বা বারবার হলে বিশেষ সতর্ক হতে হবে।
২) ব্যথা শরীরের অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়া
বাম হাত বেশি পরিচিত হলেও ডান হাতেও হতে পারে। এছাড়া কাঁধ, পিঠ, গলা, চোয়াল, দাঁত বা উপরের পেটে ব্যথা বা অস্বস্তি ছড়িয়ে যেতে পারে।
৩) শ্বাসকষ্ট
বুকব্যথা থাকুক বা না থাকুক, হঠাৎ শ্বাসকষ্ট হতে পারে। কথা বলতে কষ্ট হওয়া, অল্প কাজেই হাঁপিয়ে ওঠা, বুক ভারী লাগা ইত্যাদি হতে পারে।
৪) ঠান্ডা ঘাম
হঠাৎ ঠান্ডা ঘাম, ভিজে যাওয়া, গা শিরশির করা অনেক সময় হার্ট অ্যাটাকের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ।
৫) বমি বমি ভাব বা বমি
অনেকের ক্ষেত্রে গ্যাস্ট্রিক বা ফুড পয়জনিং মনে হতে পারে। উপরের পেট অস্বস্তি, বমিভাব, অম্বল, ঢেকুর ইত্যাদির সঙ্গে ঘাম ও দুর্বলতা থাকলে সতর্ক হওয়া জরুরি।
৬) মাথা ঝিমঝিম করা, দুর্বলতা, অস্থিরতা
রক্তচাপ কমে গেলে বা হার্টের কার্যক্ষমতা হঠাৎ কমে গেলে মাথা ঘোরা, অস্থির লাগা, ভয় বা অজানা বিপদের অনুভূতি হতে পারে।
৭) ঘুমে ব্যাঘাত ও অস্বাভাবিক ক্লান্তি
কিছু মানুষের ক্ষেত্রে কয়েকদিন ধরে ঘুমের সমস্যা, অস্বাভাবিক ক্লান্তি, কাজের আগ্রহ কমে যাওয়া দেখা যেতে পারে। এটি নিশ্চিত লক্ষণ না হলেও অন্য ঝুঁকির কারণ থাকলে গুরুত্ব দিতে হবে।
নারী, বয়স্ক ও ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে লক্ষণ ভিন্ন হতে পারে
এই গ্রুপের রোগীদের ক্ষেত্রে বুকে স্পষ্ট ব্যথা কম থাকতে পারে। তার বদলে শ্বাসকষ্ট, অতিরিক্ত ক্লান্তি, বমিভাব, ঘাম, পিঠ বা চোয়ালে ব্যথা, মাথা ঘোরা বেশি দেখা যায়। তাই এসব লক্ষণকে হালকাভাবে নেওয়া ঠিক নয়।
কখন জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে যাবেন
নিম্নোক্ত পরিস্থিতিতে দেরি না করে জরুরি সেবা নেওয়া উচিত:
১) বুকে চাপ/ব্যথা/অস্বস্তি ১০ মিনিট বা তার বেশি স্থায়ী হলে
২) বুকের ব্যথা সঙ্গে শ্বাসকষ্ট, ঘাম, বমিভাব, মাথা ঘোরা থাকলে
৩) ব্যথা হাত, কাঁধ, পিঠ, গলা, চোয়ালে ছড়িয়ে পড়লে
৪) হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে গেলে বা অস্বাভাবিক দুর্বল হয়ে পড়লে
৫) আগে থেকে হার্ট রোগ থাকলে এবং নতুন ধরনের বা বেশি তীব্র লক্ষণ দেখা দিলে
হার্ট অ্যাটাক সন্দেহ হলে তাৎক্ষণিক করণীয়
১) দ্রুত হাসপাতালে যাওয়ার ব্যবস্থা করুন, সম্ভব হলে অ্যাম্বুলেন্স ডাকুন
২) নিজে গাড়ি চালিয়ে না যাওয়াই নিরাপদ
৩) রোগীকে বসিয়ে বা আধশোয়া অবস্থায় রাখুন, আঁটসাঁট কাপড় ঢিলা করুন
৪) আতঙ্ক কমানোর চেষ্টা করুন, অযথা হাঁটাহাঁটি বা পরিশ্রম করতে দেবেন না
৫) রোগী অজ্ঞান হয়ে গেলে এবং শ্বাস-প্রশ্বাস না থাকলে সিপিআর জানা থাকলে শুরু করুন
ওষুধ বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা
কেউ আগে থেকে চিকিৎসকের পরামর্শে কিছু নির্দিষ্ট ওষুধ (যেমন বুকব্যথার জন্য কিছু ট্যাবলেট) ব্যবহার করে থাকলে সেই ব্যক্তির ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পূর্ব নির্দেশনা অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু নতুন করে নিজের সিদ্ধান্তে ওষুধ খাওয়া বা অন্যের ওষুধ খাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
হাসপাতালে গিয়ে সাধারণত কী কী পরীক্ষা ও চিকিৎসা হয়
হার্ট অ্যাটাক নিশ্চিত করা এবং দ্রুত চিকিৎসা শুরু করার জন্য হাসপাতালে সাধারণত:
১) ইসিজি করা হয়
২) রক্ত পরীক্ষা করে ট্রোপোনিনসহ হার্ট এনজাইম দেখা হয়
৩) অক্সিজেন স্যাচুরেশন, রক্তচাপ, হার্টরেট পর্যবেক্ষণ করা হয়
৪) প্রয়োজন হলে ইকোকার্ডিওগ্রাম করা হয়
৫) অবস্থা অনুযায়ী করোনারি এনজিওগ্রাম করে ব্লক কোথায় তা দেখা হয়
চিকিৎসা পরিস্থিতি অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে:
১) রক্ত জমাট কমানোর ওষুধ, ব্যথা কমানোর ওষুধ, হার্টের উপর চাপ কমানোর ওষুধ
২) ব্লক খুলতে দ্রুত এনজিওপ্লাস্টি ও স্টেন্ট
৩) কিছু ক্ষেত্রে বাইপাস সার্জারি
উদ্দেশ্য হলো যত দ্রুত সম্ভব ব্লক খুলে হার্টের পেশিতে রক্ত সরবরাহ ফিরিয়ে আনা।
হার্ট অ্যাটাক প্রতিরোধ ও জীবনযাপন (আরও বিস্তারিত)
প্রতিরোধের মূল লক্ষ্য হলো রক্তনালীর প্লাক তৈরি কমানো, রক্তচাপ-ডায়াবেটিস-কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ করা এবং জীবনযাপনে ঝুঁকি কমানো।
১) স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস
ঋতুকালীন টাটকা ফল ও সবজি, শাকসবজি, ডাল, আঁশযুক্ত খাবার বেশি খেতে হবে। ভাজাপোড়া, অতিরিক্ত তেল, গরুর চর্বি, প্রসেসড মাংস, ফাস্টফুড, ট্রান্সফ্যাট, অতিরিক্ত মিষ্টি কমাতে হবে। লবণ কম খাওয়া উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
২) নিয়মিত ব্যায়াম
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত হাঁটা, সাইক্লিং, সাঁতার, হালকা দৌড় বা ঘরোয়া ব্যায়াম উপকারী। অনেকের জন্য প্রতিদিন ৩০ মিনিট brisk walk একটি কার্যকর অভ্যাস। তবে বুকে ব্যথা বা শ্বাসকষ্ট থাকলে ব্যায়াম শুরু করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ জরুরি।
৩) ওজন নিয়ন্ত্রণ
বডি মাস ইনডেক্সের সঙ্গে কোমরের মাপও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে পেটের মেদ হার্টের ঝুঁকি বাড়ায়। ধীরে ধীরে ওজন কমানো সবচেয়ে নিরাপদ।
৪) ধূমপান ও তামাক সম্পূর্ণ বন্ধ
ধূমপান রক্তনালী সংকুচিত করে, প্লাক ফাটার ঝুঁকি বাড়ায় এবং রক্ত জমাট বাঁধার প্রবণতা বাড়ায়। ধূমপান বন্ধ করা হার্টের জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপগুলোর একটি।
৫) অ্যালকোহল এড়িয়ে চলা
অ্যালকোহল রক্তচাপ, ট্রাইগ্লিসারাইড এবং হার্টের ছন্দের উপর খারাপ প্রভাব ফেলতে পারে। অনেকের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলাই নিরাপদ।
৬) রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ
নিয়মিত পরীক্ষা করা, চিকিৎসকের নির্দেশ অনুযায়ী ওষুধ খাওয়া, এবং নিজের ইচ্ছামতো ওষুধ বন্ধ না করা খুব গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় উপসর্গ না থাকলেও ভেতরে ভেতরে ক্ষতি চলতে থাকে।
৭) মানসিক চাপ ও ঘুম ব্যবস্থাপনা
দীর্ঘদিনের স্ট্রেস, কম ঘুম, অনিয়মিত জীবনযাপন হার্টের ঝুঁকি বাড়ায়। নিয়মিত ঘুম, শ্বাস-প্রশ্বাস ব্যায়াম, সময়মতো বিশ্রাম, এবং প্রয়োজন হলে কাউন্সেলিং উপকারী হতে পারে।
নিয়মিত চেকআপ কেন জরুরি
অনেক হার্ট রোগ নীরবে বাড়তে থাকে। বছরে অন্তত একবার সাধারণ স্বাস্থ্য পরীক্ষা করলে ঝুঁকি আগেভাগে ধরা পড়ে। বিশেষ করে যাদের বয়স বেশি, পরিবারে হার্ট রোগ আছে, ধূমপান করেন, ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপ আছে, তাদের নিয়মিত:
১) রক্তচাপ মাপা
২) রক্তে সুগার পরীক্ষা
৩) লিপিড প্রোফাইল
৪) কিডনি ফাংশনসহ প্রয়োজনীয় কিছু টেস্ট
৫) চিকিৎসকের পরামর্শে ইসিজি বা ইকো
এসব করা উপকারী।
উপসংহার
হার্টের সমস্যা হলে বুকে ব্যথা, চাপ বা অস্বস্তি, শ্বাসকষ্ট, বুক ধড়ফড়, অতিরিক্ত ক্লান্তি, মাথা ঘোরা, ঘাম, বমিভাব, পা ফুলে যাওয়া—এ ধরনের লক্ষণ দেখা দিতে পারে। হার্ট অ্যাটাক সাধারণত করোনারি ধমনীর প্লাক ফেটে গিয়ে রক্ত জমাট বেঁধে ধমনী বন্ধ করে দেওয়ার কারণে হয়, যার ফলে হার্টের পেশি অক্সিজেনের অভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দ্রুত চিকিৎসা নিলে জীবন বাঁচে এবং হার্টের ক্ষতি কমে। তাই সন্দেহজনক লক্ষণ হলে দেরি না করে জরুরি সেবা নেওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ও নিয়মিত চেকআপের মাধ্যমে প্রতিরোধই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
